Profile

মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০১৭

কাশ্মিরের তরুণরা ইন্টারনেটকে সংগ্রামের হাতিয়ারে পরিণত করেছে


ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের তরুণরা ইন্টারনেটকে তাদের সংগ্রামের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক ফিচার ধর্মী বিশাল খবরে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

২০১২ সালের অক্টোবরে গেরিলা কমান্ডার মুজামমিল আমিন দার ভারতীয় বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার আগে তার পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেছিলেন। তার এই আলাপের রেকর্ড ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে এ প্রবণতার শুরু হয়ে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে। মুজামমিল ফোনে তার পরিবারকে বলেছিলেন, দুঃচিন্তা করার মতো কিছুই ঘটেনি। আজ বা কাল আমরা সবাই মারা যাবো। তাইনা? এরপরই অনেকগুলো নারীর আর্ত চিৎকারে মধ্য দিয়ে তার কণ্ঠ নীরব হয়ে যায়। কিন্তু ইউটিউবে প্রকাশ করা দারের এ আলাপ এ পর্যন্ত লাখ লাখ বার বাজানো হয়েছে।

গার্ডিয়ান বলেছে, কাশ্মিরে যে গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল এক দশকের বেশি সময় ধরে ‘নোংরা যুদ্ধের’ মাধ্যমে ২০০০’এর দশকের সূচনায় তা দমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল ভারত। এতে ‘নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং বলপ্রয়োগে গুম করার’ ঘটনা ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেছে দৈনিকটি।  ভারতীয় প্রশাসন পরবর্তীতে শান্তি স্থাপনে কাশ্মিরে ব্যর্থ হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে এ  নিবন্ধে।

১৫ বছর পরে কাশ্মিরে সে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তবে এখনো কাশ্মিরে সশস্ত্র গেরিলাদের সংখ্যা খুবই কম রয়ে গেছে। ভারতীয় পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা মোটামুটি ২১০ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু কাশ্মিরি মানুষের বিক্ষোভ আকারে এবং তীব্রতায় বাড়ছেই। গত মাসেই কাশ্মিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের বাইরে ভারতীয় এক উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার কাপড়-চোপড় খুলে নেয় ক্ষুব্ধ মানুষ। পরে থাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যাও করা হয়। এ ছাড়া, কাশ্মিরে এই প্রথম বিক্ষোভের নেতৃত্বে নামছেন তরুণীরা। তরুণদের মতোই তারাও হতাহত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন।

ভারতের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এএস দৌলত গার্ডিয়ানকে বলেছেন, তরুণ কাশ্মিরিদের মনোভাব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাদের মধ্যে অসহায় অবস্থা বিরাজ করছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, কাশ্মিরের তরুণরা মরতে মোটেও ভয় পান না।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির শেষ দফা গণবিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ সালে। পুলিশের ফাঁস হয়ে যাওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় কাশ্মিরের মাত্র এক চতুর্থাংশ মানুষের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৭০ শতাংশ হয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মিরের পুলিশের মহাপরিচালক এসপি ভাইদ বলেন,  কাশ্মিরে গোলযোগ সৃষ্টি করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিধ্বনি করে তিনি আরো বলেন, কাশ্মিরের মানুষদের মগজ ধোলাই করতে এ মাধ্যম ব্যবহার করছে পাকিস্তানিরা।

গত এপ্রিলে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের রাজ্যসরকার সামাজিক যোগাযোগের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয়। ফেসবুক, টুইটারসহ ২২টি মাধ্যম হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু কাশ্মিরের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর পুলওয়ামারর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্ররা মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে অনলাইনে চলে আসেন। তারা বলেন, আমরা ভিপিএন ব্যবহার করেছি। ভারতীয়রা ভিপিএন বন্ধ করছে উল্লেখ করে বলেন, অন্তত আরো ৫০টি ভিপিএন আছে।

পুলওয়ামার ছাত্রদের কাছে এককালে পশ্চিমা ফ্যাশন দুরস্ত পোশাক জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এ বছর ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে পাথর ছোঁড়া এবং সে ঘটনা ইন্টারনেটে লাইভ তুলে ধরা এখন পুলওয়ামার ছাত্রদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ফেসবুকের লাইভকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ হিসেবে উল্লেখ করেন আমির নামের এক ছাত্র। গত এপ্রিলে লাইভ প্রকাশ করা একটি ফুটেজে দেখা গেছে, ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এক ছাত্রের ঘাড় পা দিয়ে চেপে ধরে রেখেছেন। আর অন্যরা তাকে ধাতব ডাণ্ডা দিয়ে পেটাচ্ছেন। এ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় গোটা কাশ্মিরের কলেজগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ভারতীয় বাহিনীকে অচল করে দেয়ার তৎপরতা চলছে কাশ্মিরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া বার্তার ভিত্তিতে গ্রামবাসীরা নিয়মিত বন্দুক যুদ্ধের এলাকায় ছুটে যান। ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি করেন তারা। ঘেরাও হয়ে পড়া গেরিলাদের সরে পড়ার অবকাশ এ ভাবে তৈরি করেন তারা। এক গ্রামবাসী বলেন, ভারতীয় সেনারা এসে যদি তছনছ করতে থাকে বা কাউকে আটক করে অমনি আমরা মেসেজ পাঠাই। সাথে সাথেই দলে দলে মানুষ ছুটে আসে এবং ভারতীয় বাহিনীকে নিবৃত্ত করে।

আগে যে কথা কেবল মাত্র ফিসফিস করে বলা যেত এখন তা বিশ্ব জুড়ে সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠছে। এপ্রিলে একজন কাশ্মিরে তরুণকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের ঘটনা এভাবেই বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ফেসবুকে কাশ্মিরে ছাত্রদের টাইমলাইনে এ ধরণের অসংখ্য ছবি পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে অস্ত্র হাতে গেরিলাদের ছবি। ভারতীয় বাহিনীর নির্যাতনে আহত কাশ্মিরিদের ছবি। আমির বলেন, কাশ্মিরিরা তাদের কথা তুলে ধরছেন। তাদের কথা প্রকাশের এটাই সেরা পথ এ পথ কেউ বন্ধ করতে পারবে না।
কাশ্মিরে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়েছেন ভিনাই কাউরা। গেরিলা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কাউরা বলেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম কাশ্মিরে তিক্ত তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টি করা হচ্ছে না। বরং কাশ্মিরে এ রকম তরুণ সমাজের অস্তিত্বের কথাই কেবল তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের বোঝা উচিত যে কাশ্মিরে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করতেই হবে। তা হলেই কেবল এ সব তরুণকে কাজে লাগানো যাবে।#



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন