১৭৫৭ সালে সুবে বাংলাকে পরাধীন করার মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসনাধীন ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়। আর ১৮৮৮ সালে মিশর দখল করা হয়। মুসলমানদের দুই সাম্রাজ্যের মাঝখানে থাকা উসমানীয়া সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তুরস্কে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ ও আরব জনপদে আরব জাতীয়বাদ তৈরি করে ব্রিটিশরা।
বৃটিশদের সাথে সাথে আরব জনপদে উপনিবেশ ও দখলদারিতে লিপ্ত ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, অস্ট্রিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলো। তবে উসমানীয়া সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে আরব বিশ্বকে উপনিবেশে পরিণত করার মূল কুচক্রী ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স।
মিশর দখলের ২৬ বছর পর ১৯১৪ সালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যা ১৯১৮ সালে শেষ হয়। এই যুদ্ধের দ্বিতীয় বছর ১৯১৫ সালে বৃটেনের স্যার মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের ফ্রান্সিস জর্জেস পিকোট উসমানীয়া খেলাফতকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়ার গোপন চুক্তি করে।
‘সাইকস-পিকোট চুক্তি’ অনুযায়ী ব্রিটেন জর্ডান, ইরাক ও কুয়েত এবং ফ্রান্স সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিন তুরস্ক ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব করে।
যদিও এ সময় আরবদের সাথে ব্রিটিশরা চুক্তি করেছিল যে তুরস্ক কেন্দ্রিক উসমানীয়া খেলাফত থেকে আরব জাতি স্বাধীনতা পাবে। আরেকটি চুক্তি হয়েছিল ইউরোপে থাকা ইহুদিদের ফিলিস্তিনে থাকার জন্য বসতি নির্মাণের সুযোগ দেবে ব্রিটিশরা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা গেল আরবদের সাথে করা চুক্তি না মেনে নিজেদের মধ্যে আরব বিশ্বকে ভাগ করে নেয়া আর ইহুদিদের ফিলিস্তিনে পুনর্বাসনের চুক্তি ব্রিটেন-ফ্রান্স ঠিকই মেনে নিয়েছে।
ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত জাতিপুঞ্জ বা লিগ অব নেশনস অনেকটা সাইকস-পিকোট চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী উসমানীয়া খেলাফতকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে বন্টন করে দেয়।
আর ব্রিটেন-ফ্রান্স আরব দেশগুলোতে নিজেদের বশংবদ আরব গোত্রপতিদের রাজা-শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এ সময় ব্রিটেনের ভাগে আসা ইরাককে রাজা হিসেবে বসানো হয় হাশেমী বংশের কুখ্যাত দালাল ফয়সালকে।
ফয়সালের সময়ে ইরাকের প্রাচীন জমানার ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ ও প্রত্নসম্পদসমূহ লুট হতে শুরু করে। পশ্চিমারা যেমন দুহাতে লুট করে, তেমনি পয়সার লোভ দেখিয়ে স্থানীয় লুটেরাদের দিয়েও ঐতিহাসিক সম্পদ হাতাতে থাকে পশ্চিমারা। এ সময় সিরিয়-মিশরসহ আরবের সকল প্রাচীন জনপদই এই লুণ্ঠনের শিকার হয়।
আর ফয়সালের সময়কালেই ১৯২০ এর দশকে আরব বিশ্বের তিন হাজারেরও বেশি দলিল-দস্তাবেজ ব্রিটেনের বার্মিংহামে নিয়ে যান ইরাকের কলদিয় খ্রিস্টান পাদ্রী আলফন্স মিনগানা।
দলিলগুলো ইরাক থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যেতে মিনগানাকে অ্যাডওয়ার্ড ক্যাডবারি অর্থের যোগান দেন। আর এই দলিলগুলোর মধ্যেই প্রাচীনতম কুরআনের পান্ডুলিপির অংশ ছিল বলে দাবি করেছে ব্রিটেন ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি।বিবিসির এ দাবির সূত্র ধরে তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, অ্যাডওয়ার্ড ব্রিটেনের বার্মিংহামের বিখ্যাত চকলেট প্রস্তুত প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাডবারি’র প্রতিষ্ঠাতা জন ক্যাডবারির নাতি। তিনি পারিবারিক চকলেট ব্যবসায় জড়িত থাকলেও কলেজ প্রতিষ্ঠা, মিডিয়া ব্যবসা ও ব্যাবসা বিষয়ক তাত্ত্বিক ছিলেন।
আর পাদ্রী মিনগানা তুরস্কের সীমান্ত সংলগ্ন ইরাকের মুসলের জাখো জেলার আসিরিয়ান গ্রাম শারানিসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১৩ সালে বার্মিংহামের সেলি অক এলাকার খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী ‘কোয়্যাক’ এর আমন্ত্রণে দুই বছরের জন্য ব্রিটেনে যান। কিন্তু ১৯১৫ সালে তিনি নরওয়েজিয়ান ছাত্রী এমা সোফি ফ্লোরকে বিয়ে করে ব্রিটেনে থেকে যান এবং ম্যানচেস্টারের জন রিল্যান্ড লাইব্রেরিতে আরবী পান্ডুলিপি বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন, এখানে তিনি ১৯৩২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।এর মধ্যেই ১৯২০ এর দশকে জন রিল্যান্ড লাইব্রেরি ও অ্যাডওয়ার্ড ক্যাডবারির কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিন দফা ইরাক সফর করেন পাদ্রী মিনগানা।
১৯২৪ সালের বসন্তে প্রথম সফরে লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে যান মিনগানা। সেখান থেকে তিনি জন রিল্যান্ড লাইব্রেরির জন্য ২২টি আরবী ও সিরীয় ভাষায় লিখিত কিছু প্রাচীন পান্ডুলিপি নিয়ে ব্রিটেনে ফেরেন। এ সময় ক্যাডবারির জন্যও কিছু সিরীয় পান্ডুলিপি আনেন তিনি।
পরের বছর শরৎকালে অ্যাডওয়ার্ড ক্যাডবারির একক অর্থায়নে সিরিয়া, ইরাক ও দক্ষিণ কুর্দিস্তান সফরে গিয়ে বেশ কিছু সিরীয় পান্ডুলিপির সঙ্গে কিছু আরবী পান্ডুলিপিও সংগ্রহ করে ব্রিটেনে ফেরেন মিনগানা।
সর্বশেষ ১৯২৯ সালে সিনাই উপত্যকা ও মিশরের নীল নদের দুই তীরবর্তী এলাকা সফর করে বেশ কিছু আরবী পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন, এর মধ্যে কয়েকটি পান্ডুলিপি ছিল মিশরের কপ্টিক এবং গ্রিক ভাষায় লিখিত। ১৯৩২ সালে মিনগানা ব্রিটেনে ফেরার পর প্রথম দু বছর আরব থেকে আনা দলিলের ক্যাটালগ তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে ১৯৩৪ সালে তিনি সেলি অক কলেজসমূহের লাইব্রেরির কিউরেটর হিসেবে যোগ দেন। সেলি অক কলেজগুলো ছিল মূলতঃ প্রটেস্টান্ট খৃস্টান সম্প্রদায়ের বিশেষ গোষ্ঠী
‘কোয়েকার’ এর সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘ধর্মীয় বন্ধু সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন কলেজের ফেডারেশন। কোয়েকার বন্ধু সমাজের অন্যতম সংগঠক ছিলেন অ্যাডওয়ার্ড ক্যাডবারি। পরবর্তীতে অন্য প্রটেস্টান্টরাও সেলি অকের বিভিন্ন কলেজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন।
------------------------------------------------------------------------
সেলি অক কলেজগুলোতে ধর্মতত্ত্ব ও সমাজকর্ম বিষয়ে পড়ানো হত এবং শিক্ষক প্রশিক্ষন দেয়া হত। এগুলো পরবর্তীতে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘ওয়েস্টহিল কলেজ’ ২০০১ সালে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একীভূত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে উডব্রুক কলেজ ও ফারক্রফ্ট কলেজ ছাড়া সব কলেজই বন্ধ হয়ে গেছে।
সেলি অক কলেজ ফেডারেশনের লাইব্রেরির কিউরেটরের দায়িত্ব নেয়ার পর আলফন্স মিনগানা মাত্র তিন বছর বেঁচে ছিলেন। তবে শেষ বেলাতেও প্রাচীন পান্ডুলিপি ও দলিল-দস্তাবেজ সংগ্রহ করে লাইব্রেরিটি সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি।এর অংশ হিসেবে মিনগানা ১৯৩৪ সালের মে মাসে এবং ১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সুইজারল্যান্ডের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ব্যবসায়ী তরুণ এরিক ভন শেরলিংয়ের কাছ থেকে আরব থেকে আনা বেশ কিছু দলিল দস্তাবেজ কেনেন।
এরিক ভন ছিলেন একজন সুইডিশ কূটনীতিকের ছোট ছেলে, তিনি বাবার কর্মস্থল নেদারল্যান্ডের রটারডামে ১৯০৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলের পাঠ চুটিয়ে লেইডেনের প্রাচীন বইয়ের বিক্রেতা জেকব গিন্সবার্গের সাথে কাজ শুরু করে এরিক আরবদেশের প্রাচীন পান্ডুলিপি, আরবী ও ল্যাটিন ভাষার উপর বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে দক্ষতা অজর্ন করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ওই সময়ে আরব বিশ্বের প্রত্নসম্পদ, প্রাচীন পান্ডুলিপি ও দলিল-দস্তাবেজ এতই হরিলুট হচ্ছিল যে মাত্র ২১ বছর বয়সেই এরিক ভন ওই সবের একজন আন্তর্জাতিক কারবারিতে পরিণত হন।
ভাষা বিজ্ঞানী অস্ট্রেরিয়ান অ্যাডল্ফ গ্রোম্যানকে প্যাপিরাস গাছের বাকল দিয়ে তৈরি কাগজের উপর লিখিত মিশরের কিছু প্রাচীন পান্ডুলিপি (প্যাপিরি) দেখিয়েছিলেন এরিক ভন। গ্রোম্যান আরব, মিশর ও সেমিটিক তত্ত্ববিদ ছিলেন। তিনি এরিকের সংগ্রহগুলো দেখে এসব কিনতে জার্মানির কিছু লাইব্রেরিকে সুপারিশ করেন। কিন্তু ৩০ এর দশকে জার্মানি থেকে বাইরের কারো কাছে মূল্য পরিশোধ করা সুযোগ ছিল না। ফলে জার্মানির বদলে ব্রিটেনে মিনগানার কাছে ওই প্যাপিরি এবং কুরআনের প্রাচীন পান্ডুলিপির ভগ্নাংশ বিক্রি করে দেন এরিক ভন।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, এরিক ভনের কাছ থেকে ১৯৩৬ সালে আলফন্স মিনগানার কেনা দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে চামড়া ও প্যাপিরাসের উপর লিখিত কুরআনের সাতটি প্রথম যুগের পান্ডুলিপি ছিল।
প্রসঙ্গত, সেলি অক কলেজ ফেডারেশন লাইব্রেরিটি পরবর্তীতে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গীভূত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাডওয়ার্ড ক্যাডবারি ও আলফন্স মিনগানার সংগ্রহ নিয়ে ‘‘অ্যাডওয়ার্ড ক্যাডবারি গবেষণা লাইব্রেরি’ প্রতিষ্ঠা করেছে।এই লাইব্রেরিতে বিশেষ সংগ্রহ হিসেবে মজুদ রয়েছে মিনগানার সংগ্রহগুলো। যা ‘মিনগানা সংগ্রহ’ হিসেবে পরিচিত। মিনগানার সংগ্রহগুলোর উপর ১৯৩৩ সালে ৬০৬টি সিরীয় পান্ডুলিপির ক্যাটালগ, ১৯৩৬ সালে ১২০টি খ্রিস্টান আরবী পান্ডুলিপি ও ১৬টি সিরীয় পান্ডুলিপি এবং ১৯৩৭ সালে মিনগানার মৃত্যুর দুবছর পর ১৫২টি খ্রিস্টান আরবী পান্ডুলিপি ও ৪০ টি সিরীয় পান্ডুলিপির ক্যাটালগ প্রকাশিত হয়।
(তথ্য সূত্র- উইকিপিডিয়া)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন