কাশ্মীর রণাঙ্গনের কমাণ্ডার জনাব আমজাদ
বেলাল বর্ণনা করেন-
মুহাররম মাসের দশ তারিখে আমি সোপুর
গিয়েছিলাম। সেখানে একজন সাথী আমাকে নিকটবর্তী গ্রামের এক মুজাহিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে অনুরোধ জানায়। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করেন,
‘ভাই আমজাদ! গত বছর আমাকে এক সাথীর সাথে একত্রে গ্রেফতার করে বারমুলার এক ইন্টারোগেশন সেন্টার (নির্যাতন কেন্দ্রে)নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন ও একরাত চরম নির্যাতনের পর আমাকে এক কর্ণেলের
সামনে হাজির করা হয়। কর্ণেল আমাকে উদ্দেশ্য
করে বলে, তোমাকে তো দেখতে ভালো মানুষ
বলে মনে হয়। একটা শর্ত পূর্ণ করলেই
তোমাদেরকে ছেড়ে দেব।
আমি বললাম, কী সে শর্তটি?
কর্ণেল কুটিল হেসে বলল, তোমার একটি মেয়েকে এক রাতের জন্যে আমার খেদমতে পাঠিয়ে দেবে। তার জানোয়ারের মত চেহরার দিকে তাকিয়ে আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সজোরে তার গালে একটা চড় কষে দিলাম।
জানোয়ারটা ঘুরে পড়ে গেল। উঠে বিড় বিড় করে বলতে লাগল- দেখাচ্ছি তোমাকে মজা।বুঝবে এবার কোন ভীমরুলের বাসায় ঢিল ছুড়েছ। বলতে না বলতে সাত আটজন সিপাহী আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
রাইফেলের বাটের আঘাত, কিল ঘুঁষি আর বুটের লাথিতে আমার দেহ থেতলে যায়।এ সময় জীপের স্টার্ট নেয়ার শব্দ শুনতে পাই।এক ঘণ্টার মধ্যে ওরা আমার বড় মেয়েকে ধরে নিয়ে আসে। আমাকে একটি খুঁটির
সাথে বেধে রাখে ওরা। এরপর চোখের সামনে যা ঘটেছে একজন পিতার পক্ষে মেয়ে সম্পর্কে তা বলা যায় না।
আমি চীৎকার করে অনুনয় বিনয় করতে থাকি।
কিন্তু কিছুতেই পশুদের মনে দয়া উদয় হল না।
এখানেই শেষ নয়। এপর ওরা আমার মেঝ
মেয়েকে নিয়ে আসে। তার সাথেও সেই একই
আচরণ করে। এ কিয়ামত সমান দৃশ্য দেখে আমার
হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চোখে আগুন ঝলসাতে থাকে। মনে হচ্ছিল,আমি এখনই মরে যাব।
এরপর ওরা আমার দুই নাবালেগা হাফেজা মেয়েকেও হাজির করে। এবার আর স্থির থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। চিৎকার দিয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে যাই। তখন আমার বড়
মেয়েকে বেয়নেট মেরে শহীদ করে। বাকীদের
গাড়ীতে করে গ্রামে ফেরত পাঠায়। জালেম সৈন্যরা আমার ঘর জ্বালিয়ে দেয় আর আমাকে জম্মুর হেরা নগর জেলে পাঠিয়ে দেয়।আমার মেজো মেয়েটি ছিল বিবাহিতা, দু সন্তানের জননী। এ ঘটনার পর সন্তান
রেখে তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয়। এ
শোকে আমার স্ত্রী পাগল হয়ে গেছে। মেয়েরা এক
বছর ধরে এই পোড়া ঘরে জীবন মরণের
সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এক বছর পর্যন্ত তারা লজ্জায় ঘর থেকে বের হয়নি। আর হবেই বা কিভাবে? বাপ বন্দি, মা পাগল, ইজ্জত লুন্ঠিত। বল আমজাদ,বল! আমরা কোথায় যাব?
কী করব? আমাদেরকে এ দেশ থেকে কোথাও
বাইরে নিয়ে যাও।
ভাই, যদি তুমি আর এক বছর আগে আসতে,
তবে হয়তো আমাদের ইজ্জত বাঁচতো। আমজাদ,
তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ। আমার সব কিছু
শেষ হয়ে গেছে। আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আমাদের চিৎকার কী দুনিয়ার মুসলমানদের
কানে পৌঁছে না? কেন তারা আমাদের সাহায্যের
জন্য এগিয়ে আসছে না? আমরা কি মুসলমান নই?
এক মুসলমান বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে মুহম্মদ বিন কাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ছুটে এসেছিলেন সিন্ধুতে।
আর এত কাছে থেকেও তোমরা তোমাদের
কাশ্মীরী বোনদের গগন বিদারী কানফাটা আর্তচিৎকার শুনতে পাও না?ঝিলাম নদী বয়ে যে হাজার হাজার মা বোনের লাশ তোমাদের চোখের সামনে দিয়ে ভেসে গেছে তা দেখেও কী তোমােেদর ঈমান স্ফুর্লিংগের মত জ্বলে উঠবে না?
যদি এত কিছুর পরও তোমাদের চেতনা না আসে,
তবে মনে রেখ, আমরা মরতে থাকব। দ্বীনের
হিফাজতের জন্যে সর্ব প্রকারের
কুরবাণী দিয়ে যাব। তবুও এক কাশ্মীরী জিন্দা থাকতে কাফিরের আনুগত্য স্বীকার করব না। তাতে দুনিয়ার মুসলিম আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসুক আর না আসুক।তুমি দুয়িার মুসলমানদের কাছে আমাদের পয়গাম পৌঁছে দিও। শুধু এক ভাই নয়, হাজার ভাই, হাজার বোন তাদের পথ পানে চেয়ে আছে।দয়া করে জলদী এসো, ধৈর্যের বাঁধ মানছে না আর।তাঁর এ হৃদয়-বিদারক জীবন কাহিনী শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। অসুস্থ হয়ে বিছানার ওপর ছটফট করছিলাম। সতেরো দিন পর সেই মুজাহিদের এক মেয়ে একখানা কাগজে আমার নিকট লিখে পাঠায়,
‘আমজাদ! এক ভাইয়ের কাহিনী শুনেই নির্জীবের
মত বিছানায় পড়ে গেলে? এখানে হাজারো ভাই-
বোনের জিন্দেগী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শুয়ে থাকার
সময় নেই। ওঠো, তোমাকে শত শত বোনের
ইজ্জতের হিফাজত করতে হবে।’এই চিঠি পড়ে আমার শরীরের জ্বর-তাপ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তখনই মেয়ের
পিতাকে সঙ্গে নিয়ে জিহাদের জন্যে শ্রীনগর চলে আসি।
♦সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের
পথ হল কেতাল ফী সাবীলিল্লাহ♦
- তোমার অপেহ্মায় পৃথিবী থেকে সংগৃহিত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন