![]() |
শ্রীলংকার মন গলানোর চেষ্টা মোদির |
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র সফর নিয়ে শ্রীলংকায় যখন চাপা অসন্তোষ, তখন বুদ্ধে’র শিক্ষা ও প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক সম্পর্কের মহিমা কীর্তন করে দেশটির মন গলানোর চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। মোদি’র এই প্রচেষ্টাকে দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেয়ার সার্বিক প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বুদ্ধে’র জন্ম, জ্ঞানালোক প্রাপ্তি ও অন্তর্ধান স্মরণে জাতিসংঘের সহযোগিতায় শ্রীলংকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক ভেসাক দিবস উৎসবের প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে, কলম্বোতে ভারতীয় হাই কমিশনের মাধ্যমে শ্রীলংকার পেশাজীবী ও ট্রেড ইউনিয়ন গ্রুপগুলো ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এক বিস্তারিত পত্র দিয়েছে। এতে বলা হয় যে ইতোমধ্যে দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইন্দো-শ্রীলংকা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (আইএসএফটিএ) ‘শ্রীলংকার রফতানিকারদের জন্য বলতে গেলে কোন কাজে আসছে না’। তবে, পরিকল্পিত ভারতীয় প্রকল্পগুলো শ্রীলংকার জন্য ক্ষতিকর কিছু হবে না দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাকালে মোদি জোর দিয়ে এটি উল্লেখ করেছেন।
ভারতের সঙ্গে প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে লংকার পেশাজীবীদের বিরূপ মনোভাব সত্ত্বেও মোদি কানেকটিভিটি, বাণিজ্য, শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি, জালানি ও শিক্ষা বিনিময় খাতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সহযোগিতার ক্ষেত্রটি বেশ মজবুত। কারণ, ভারত উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে ইতোমধ্যে শ্রীলংকাকে ২.৬ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে।
প্রফেশনালস ন্যাশনাল ফ্রন্টের ব্যানারে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া পেশাজীবীদের পত্রে বলা হয়: “বিদ্যমান আইএসএফটিএ’র গুরুতর ইস্যুগুলো নিস্পত্তি করতে বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এর পরিবর্তে বাণিজ্যের অতিরিক্ত সেবা খাত অন্তর্ভুক্ত করে আরেকটি নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে আপনার সরকার কলম্বো সরকারকে যে চাপ দিচ্ছে তার সঙ্গে পেশাজীবী হিসেবে আমরা একমত হতে পারছি না।”
পেশাজীবীদের ইশতেহারে আরো বলা হয়, “আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আপনার দেশে সাম্প্রতিক সফরকালে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) ত্রিনকোমালির তেল ট্যাঙ্ক ফার্ম নিয়ে যে সমঝোতায় পৌঁছেছেন, সে ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। ইন্ডিয়ান ওয়েল কোম্পানির (আইওসি) তেল ট্যাঙ্ক ফার্মের দখলকে অবৈধ ঘোষণার জন্য শ্রীলংঙ্কা সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে একটি আবেদন বিচারাধিন রয়েছে। এ অবস্থায় শ্রীলংঙ্কা পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং ইন্ডিয়ান ওয়েল কোম্পানির (আইওসি) কাছে তেল ট্যাঙ্কগুলো হস্তান্তর এবং তেল ট্যাঙ্ক ফার্মের পুরো জমি ও আইওসি’র যাতায়াত সুবিধার জন্য সম্ভাব্য সকল সড়কের জমি বরাদ্দ করতে শ্রীলঙ্কার ওপর আপনার সরকারের চাপ সৃষ্টিকে আমরা মেনে নিতে পারছি না। এতে আমরা আমাদের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করছি এবং এর বিরোধিতা করছি।”
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমসিঙ্ঘের সঙ্গে বৈঠকে মোদি উন্নয়ন কাজে সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে কানেকটিভিটি” জোরদার, সড়ক কানেকটিভিটির ব্যাপারে কিছু মহলে উদ্বেগ সৃষ্টির বিষয়গুলোও স্থান পায়। এই কানেকটিভিটি শ্রীলংকায় খুবই বিতর্কিত একটি বিষয়। এর মাধ্যমে ভারতের অনধিকার প্রবেশ ঘটতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।
তবে কর্মকর্তারা জানান, কানেকটিভিটি আলোচনার মধ্যে ছিলো একটি বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী সার্কিট গড়ে তোলা ও বিমান যোগাযোগ তৈরি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন যে তিনি কলম্বোর ও ভারতের বেনারস শহরের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনাকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে তার দেশ দ্বীপরাষ্ট্রটিতে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় তাতে শ্রীলংকারই উপকার হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজের ‘মোটো’ –সবার অগ্রগতির স্বার্থে সবার সঙ্গে সহযোগিতা– উল্লেখ করেন।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, ভারত ও শ্রীংকার নিরাপত্তা ‘অবিভাজ্য’। তাই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত ও শ্রীলংকাকে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসার সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। রাজাপাকসার অনুরোধেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে ভারতীয় হাই কমিশন থেকে জানানো হয়।
সম্প্রতি রাজাপাকসা ২০১৭ সালের মধ্যে শ্রীলংকার বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দেন রাজাপাকসা। তবে, সম্প্রতি তার ভারত-বিরোধী মনোভাব কেটে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে কলম্বোতে মোদির সঙ্গে তার প্রায় আধ ঘন্টা ধরে বৈঠক হয়।
সূত্র মতে, তাদের এই বৈঠক ছিলো বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ ও আন্তরিক। রাজাপাকসা ও মোদি কেউই রাজনৈতিক বিষয়ে কোন আলোচনা করেননি। তারা দুদেশের মধ্যে ‘ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলা নিয়ে কথা বলেছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্বাভাবিক প্রত্যাশা মতো, রাজাপাকসা ভারতের সঙ্গে তার দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চুক্তি নিয়ে কোন উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। অথচ দেশের বিভিন্ন মহল থেকে এর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট তার বদলে সিরিসেনা-বিক্রমাসিঙ্ঘে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ঘাটতিগুলোর সমালোচনা করেন। তার আমলে নেয়া অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে আছে বলেও দু:খ প্রকাশ করেন তিনি।
জানা গেছে, চীনকে হামবানতোতা বন্দর লিজ দেয়ার বিষয়ে রাজাপাকসার কাছে মোদি
জানতে চেয়েছেন। চীনের সঙ্গে রাজাপাকসার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি মোদিকে জানান যে চীনের সঙ্গে চুক্তিটি সন্তোষজনক নয় এবং চীনারা এ নিয়ে সময়ক্ষেপন করছে। আলোচনার জন্য ভারত সফর করবেন বলে সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে মোদি’র সঙ্গে রাজাপাকসার বৈঠক শেষ হয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন